Translate

জ্বলতে জ্বলতেই স্বাধীন হবে কাশ্মীর

Friday, April 29, 2016

0 মন্তব্য(গুলি)

ভারত-পাকিস্তানের স্বাধীনতার কালে জন্মু ও কাশ্মীর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের আর দশটা অঙ্গরাজ্যের মতো ছিল না, এটি ছিল ১৪০ টি পূর্ণ ক্ষমতা সম্পন্ন করদ রাজ্যের অন্যতম। ফলে ব্রিটিশ শাসনের অবসানে এই রাজ্যগুলি স্বাধীন থাকবে নাকি ভারত পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হবে তা নির্ধারণের স্বাধীনতা ছিল ঐ রাজ্যগুলিরই। জন্মু-কাশ্মীরের রাজা হরি সিং স্বাধীন থাকার ইচ্ছাই পোষণ করেছিলেন। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই পরিস্থিতির চাপে পড়ে তিনি বাধ্য হয়েছিলেন ভারতের সাহায্য গ্রহণ করতে। ১৯৪৭ এর সেপ্টম্বর মাসে পুঞ্চ অঞ্চলের অধিবাসীরা জন্মু-কাশ্মীরের সরকারের বিরুদ্ধে একটি অভ্যুত্থান সংগঠিত করে। কিছুদিনের মধ্যেই উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের পার্বত্য অধিবাসীরা জন্মু-কাশ্মীরের উপর আক্রমণ চালায়। এ সবের পেছনে পাকিস্তানের মদদও ছিল। এরকম একটা পরিস্থিতিতেই ১৯৪৭ সালের ২৬ অক্টোবর ভারত ও জন্মু-কাশ্মীরের মধ্যে একটি “অন্তর্ভুক্তি সংক্রান্ত দলিল”(Instrument of Accession) স্বাক্ষরিত হয়। শর্তছিল ভারত কেবল প্রতিরক্ষা ও পরিরাষ্ট্র নীতি বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারবে, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নয় এবং কাশ্মিরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবার পর পর গণভোটের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে কাশ্মীর ভারতের সাথে থাকবে নাকি স্বাধীন থাকবে। সার্বভৌমত্বের ব্যাপারে চুক্তির ৮ ধারায় স্পষ্ট উল্ল্যেখ ছিল: “Nothing in this Instrument affects the continuance of my Sovereignty in and over this State, or, save as provided by or under this Instrument, the exercise of any powers, authority and rights now enjoyed by me as Ruler of this State or the validity of any law at present in force in this State.” অর্থাত হরি সিং পরিস্কার করে দিয়েছিলেন এই প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত চুক্তি মানে এই না যে তিনি জন্মু-কাশ্মীরের স্বাধীনতা ভারতের হাতে তুলে দিচ্ছেন। শুধু তাই না, তিনি ভারতের ভবিষ্যত কোন সংবিধান মেনে চলবেন এরকম কোন গ্যারেন্টিও দেননি, চুক্তির ৭ ধারায় বলা আছে:“Nothing in this Instrument shall be deemed to commit in any way to acceptance of any future constitution of India or to fetter my discretion to enter into agreement with the Government of India under any such future constitution. ”
(সুত্র: Instrument of Accession of Jammu and Kashmir State 26 October, 1947, Legal Document No 113
Click This Link)

ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু ঐ চুক্তি স্বাক্ষরের ৬ দিন পর ঘোষণা করেন:
“We have declared that the fate of Kashmir is ultimately to be decided by the people. That pledge we have given, and the Maharaja has supported it, not only to the people of Kashmir but to the world. We will not and cannot back out of it. We are prepared when peace and law and order have been established to have a referendum held under international auspices like the United Nations. We want it to be a fair and just reference to the people and we shall accept their verdict. I can imagine no fairer and juster offer.”
(সুত্র: Click This Link)

অর্থাত “ আমরা ঘোষণা করেছি যে কাশ্মিরের ভাগ্য কাশ্মিরের জনগণই নির্ধারণ করবে। শুধু কাশ্মীরের জনগণই নয়, সারা দুনিয়ার কাছে আমরা এই প্রতিজ্ঞা করেছি আর মহারাজা আমাদের সমর্থন দিয়েছেন। এর অন্যথা আমাদের দ্বারা সম্ভব নয়। আমরা প্রস্তুত আছি, যে মুহুর্তে কাশ্মীরে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে, সে মুহর্তেই জাতিসংঘের মতো কোন আন্তর্জাতিক নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানের অধিনে গণভোটের আয়োজন করা হবে। আমরা চাই এ নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে, জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটবে এবং আমরা এই জনরায় মেনেও নেব। এর চেয়ে ভালো এবং ন্যায়বিচারমূলক কোন প্রস্তাব তো আর আমার মাথায় আসছে না।” হ্যা, ন্যায় বিচারই বটে! নেহেরু এ কথা বলার পর ৬৩ বছর পার হতে চলেছে, ভারতীয় সাম্রজ্যবাদের ভয়ংকর থাবার নীচে থেকে কাশ্মীরে আর শান্তি-শৃঙ্খলা আর ফিরে এল না, গণভোটের তো প্রশ্নই আসে না!

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ইরাক দখলের কালে ১৬৬ জন ইরাকী নাগরিক প্রতি একজন করে মার্কিন সেনা মোতায়েন করেছিল। আর কাশ্মীরে ২০ জন নাগরিক প্রতি একজন ভারতীয় সেনা বা আধা সেনা মোতায়েন আছে। কাশ্মীরে মোট জনসংখ্যা ১ কোটির সামান্য বেশি। আর ভারতীয় সেনা মোতায়েন হলো ৩ লক্ষ, ৭০ হাজার রাষ্ট্রীয় রাইফেল সেনা ও ১ লক্ষ ৩০ হাজার সিআরপিএফ জোয়ান। এছাড়াও আছে রাজ্যের লাখ খানেক পুলিশ ও গোয়েন্দা বাহিনী। এই সশস্ত্র বাহিনীগুলোকে দেয়া হয়েছে মানুষ খুন করার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা। ১৯৯০ সালের ৫ জুলাই কাশ্মীরে সামরিক বাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা আইন (আরমড ফোর্সেস স্পেসাল পাওয়ার এক্ট) জারি করে তাদের হাতে এই ক্ষমতা তুলে দেয়া হয়। এই আইনের ৪(এ) ধারায় বলা আছে যে, সশস্ত্র সামরিক বাহিনী যে কোন সন্দেহভাজন নাগরিককে হত্যা করতে পারবে।(সূত্র: স্যোসালিস্ট ইউনিটি সেন্টার অব ইন্ডিয়ার বাংলা মুখপাত্র গণদাবীর ৬-১২ আগষ্ট সংখ্যা http://www.ganadabi.in/issues2010/gd080610.pdf) এই বিশেষ ক্ষমতায় বলিয়ান হয়ে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী গোটা কাশ্মীর উপত্যকা জুড়ে হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে।

এই পরিপ্রেক্ষিতকে মাথায় রেখে আমরা সাম্প্রতিক বিক্ষোভের কারণ খোজার চেষ্টা করব।

৮ই জানুয়ারী, ২০১০, ১৬ বছর বয়সী ইনায়েত খান বিকেলে কোটিং সেরে বাড়ি ফিরছিল। শ্রীনগরের বাদশা চকে প্রতিবাদ সভা চলছিল। পুলিশ প্রতিবাদীদের “ছত্রভঙ্গ করার” উদ্দেশ্যে গুলি চালায়। গুলিবিদ্ধ ইনায়েত, পরেরদিন হাসপাতাল থেকে বাড়ি না গিয়ে কবরস্থানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে।

৩১ জানুয়ারী, ১৩ বছরের ওমর ফারুক শ্রীনগরের গণি মেমরিয়াল স্টেডিয়ামে বন্ধুদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলছিল। পুলিশের কাদানে গ্যাসের শেলের আঘাতে সেদিন তার সব খেলা সাঙ্গ হয়।

৫ ফেব্রুয়ারী, কাশ্মীর যেদিন ওয়ামিকের শোকপালনে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল, সেইদিন আর এক বালক জাহিদ ১৪ বছর বয়সে বিএসএফএর গুলিতে প্রাণ হারায়।

১৩ এপ্রিল, সোপুরের সরকারি স্কুলের একাদশ শ্রেণীর ছাত্র ১৭ বছরের যুবক যুবের আহমেদ ভাট ঝিলাম নদীর পাড়ে বসেছিল। বিক্ষোভরত কিছু মানুষ পুলিশের তাড়া খেয়ে সেখানে চলে আসে। পুলিশ নির্বিচারে সবার উপর ঝাপিয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, পুলিশ জুবের সহ প্রত্যেককে নদীতে ঝাপ দিতে বাধ্য করে। অন্যরা সাতরে পাড়ে উঠতে সক্ষম হলেও, জুবের তলিয়ে যেতে থাকে। মাঝিরা বাচাবার চেষ্টা করেছিল। পুলিশ ঝাকে ঝাকে কাদানে গ্যাসের শেল ছুড়তে থাকায়, তারা জুবেরের কাছে পৌছাতে ব্যর্থ হয়। জুবের প্রাণ হারায়। ২০০৬ সালে জুবেরের বড় ভাই এহমান-উল-হক পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিল।

রাজৌরির তোফায়েল আহমেদ মাত্তু তার পিতামাতার একমাত্র সন্তান এবং দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র। ১১ জুন টিউশানি শেষে সে বন্ধুদের সাথে বাড়ি ফিরছিল। কাধে ছিল স্কুল ব্যাগ। কাছেই হয়তো কোথাও বিক্ষোভ চলছিল, তোফায়েল জানতো না। একদল যুবক পুলিশের তাড়া খেয়ে দৌড়াচ্ছিল। তোফায়েলদের দেখতে পেয়ে পুলিশ তাদেরও পিছু নেয়। ভয় পেয়ে কিশোর তোফায়েলরা সামনের গণি মেমরিয়াল স্টেডিয়ামে ঢুকে পড়ে। পুলিশ স্টেডিয়ামে ঢুকে গুলি চালায়। তোফায়েলের আর বাড়ি ফেরা হলো না। গুলি লেগে তোফায়েলের মস্তক চুর্ণ হয়ে যায়।

১২ জুন, সান্ধ্য-আইন এবং সমস্ত নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে তোফায়েলের অন্তিম যাত্রায় হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে। পুলিশ শবযাত্রাকেও রেহাই দেয় নি। মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে শবযাত্রীদের উদ্দেশ্যে কাদানে গ্যাস এবং ফাকা গুলি ছুড়ে। মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের পাচজন এবং একজন চিত্র সাংবাদিক আহত হন। পুলিশের আক্রমণ তুচ্ছ করে তোফায়েলের আত্মীয় পরিজন, বন্ধু-বান্ধব, বৃদ্ধ ও যুবক শত শত শোকাহত জনতা শেষ পর্যন্ত স্থানীয় ঈদগাহে সমবেত হতে এবং শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়। ঈদগাহ থেকে ফেরার পথেও পুলিশ দলবদ্ধ জনতার উপর কাদানে গ্যাস বর্ষণ করে।

সমস্ত কাশ্মীর উপত্যকা জুড়ে তোফায়েল হত্যার বিরুদ্ধে স্বত:স্ফুর্ত বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষুব্ধ জনতার উপর পুলিশ নির্মম ভাবে লাঠি চালায়। রাজৌরিতে সিআরপিএফ-এর রাইফেলের বাটের আঘাতে সাঙ্ঘাতিক আহত হয় রফিক বাঙরু। বয়স ২৪। সংকটাপন্ন অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভার্তি করা হয়। এক সপ্তাহ জীবণ-মরণ লড়াইয়ের পর রফিক ১৯ জুন মৃত্যুর কাছে আত্মসর্ম্পন করতে বাধ্য হয়। রফিক তাদের পরিবারের সপ্তম বলি। ১৯৯০ সালে গোলাম রসুল বাঙরুকে বিএসএফ তুলে নেয় যাওয়ার পর থেকে নিখোজ। বাকিরা বিভিন্ন সময়ে পুলিশের গুলিবর্ষণের শিকার।

২০ জুন, রফিককে কবর দিয়ে, যখন রফিকের আত্মীয়-বন্ধুরা ফিরে আসছিলেন, পথিমধ্যে তারা আবারও আক্রান্ত হন। পাচজন সিআরপিএফ এর গুলিতে আহত হয়। কিন্তু ১৭ বছরের কিশোর জাভেদ আহমেদ মাল্লাকে বাচানো যায়নি। জাভেদ ছিল তার পিতামাতার একমাত্র পুত্র সন্তান।

২৫ জুন, সোপুরে তথাকথিত, সংঘর্ষে দুজন যুবক সিআরপিএফ এর গুলিতে নিতহ হয়। পুলিশ ঐ দুজনের দেহ তুলে নিয়ে যায়। পুলিশি অবরোধ উঠে যাওয়ার পর স্থানীয় মানুষজন নিহতদের লাশ ফেরত দেয়ার দাবীতে বিক্ষোভ শুরু করে। টহলদারী সিআরপিএফ বাহিনী কোন রকম সতর্কতা না দেখিয়ে বক্ষোভকারী জনতার উপর গুলি চালায়। ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রি শাকিল আহমেদ গণাই(২৪) যন্ত্রপাতি কিনতে বেরিয়েছিল। গুলি লেগে রাস্তাতেই লুটিয়ে পড়ে। ফিরদৌস আহমেদ কাকরু(২০) বাগানের পরিচর্যা করছিল। সিআরপিএফ তাকেও ছাড়ে নি। দুই যুবকের তাতক্ষণিক মৃত্যু হয়।

২৭ জুন পুলিশের গুলিতে বিলাল আহমেদ ওয়ানির মৃত্যু হয়। সাকিল আর ফিরদৌস হত্যার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল প্রদক্ষিণ করছিল সোপুরের রাস্তা। রাজ্য সরকারের জন্য স্বাস্থ্য কারিগরি দপ্তরের শ্রমিক বিলাল মিছিল দেখছিল। পুলিশ মিছিল লক্ষ্য করে গুলি চালালে বিলাল মারা যায়।
২৮ জুন সোপুরে আবারও গুলি চলে। দুজনের মৃত্যু হয়। তাদের একজন ৯ বছরের বালক তাকির আহমেদ। অপরজন কলেজের ১ম বর্ষের ছাত্র তাজামুল বসির ভাট।

২৯ জুন পুলিশের গুলিতে অনন্তনাগে আরো তিনজন নিহত হয়- ইন্তিয়াক আহমেদ খান্ডে(১৫), সুজাত্তুল ইসলাম(১৮) এবং ইমতিয়াজ আহমেদ ইতু(১৮)। (সূত্র: এই মৃত্যু তালিকা নেয়া হয়েছে কলকাতা থেকে প্রকাশিত মাসিক অনীক এর জুলাই ২০১০ সংখ্যা থেকে)
........... তালিকা আর কত বড় করতে হবে! এ হত্যাকান্ডগুলোর ধরণ/ধারণ খতিয়ে দেখলে অনুমান করা শক্ত নয় একটা জনগোষ্ঠীর তরুণ অংশকে একরকম খেয়াল খূশি মতো খুন করার প্রতিক্রিয়া সেই জনমানসের উপর কেমন হতে পারে। ইসরায়েলী দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি মুক্তিকামী জনতার মতোই পাথর হাতে বুলেটের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে এসেছে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ। হত্যা-বিক্ষোভ-হত্যা চলছেই। সাম্প্রতিক বিক্ষোভের ১০০তম দিনে হত্যাকান্ডের সংখ্যা ছিল ৯৬। ইতোমধ্যে তা ১০০ ছাড়িয়ে গেছে। আর পুরনো হত্যাকান্ডগুলোর কথা না হয় নাই তুললাম। ইতোমধ্যে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর হাতে কাশ্মীরের ৭০ হাজার মানুষ খুন হয়েছে যার অধিকাংশই যুবক। কাজেই এরকম হত্যাকান্ড নির্যাতন লুণ্ঠনই কাশ্মীরের দিনলিপি। একদিকে সামরিক বাহিনীর নির্যাতন অন্যদিকে অর্থনৈতিক বৈষম্য, তীব্র বেকারত্ব, শিল্প-কৃষির অনগ্রসরতা ইত্যাদি কাশ্মীরবাসীকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় দখলদার ভারতের সাথে তাদের সম্পর্কের স্বরুপ কি। কলকাতা থেকে প্রকাশিত মাসিক পত্রিকা অনীক এর জুলাই ২০১০ সংখ্যায় প্রণব দে লিখেছেন:”১৯৪৭ থেকে কাশ্মীর, ভারত ও পাকিস্তান- এই দুই পক্ষের মধ্যে পিষ্ট হচ্ছে। এটা দুপক্ষের মর্যাদার লড়াই অথবা অন্যবিচারে কাশ্মীর দুপক্ষেরই সেফটি ভাল্ব। শাসক শ্রেণীর সংকট মোচনে সীমান্ত যুদ্ধ বেশ শক্তিশালী দাওয়াই। আর কাশ্মীরের মানুষ(আজাদ কাশ্মীর সহ) এই রাজনৈতিক পুজর্চনায় বলিপ্রদত্ত পশু।” সাম্প্রতিক বিক্ষোভ সহ ক্ষণে ক্ষণে জ্বলে উঠে কাশ্মীরবাসী পরিস্কার বুঝিয়ে দিয়েছেন বলির পাঠা আর তার থাকতে চাননা। তারা স্বাধীন কাশ্মীরেরই স্বপ্ন দেখেন।
সম্প্রতি লন্ডনের চেথাম হাউসের চালানো এক জরিপেও এই তথ্য উঠে এসেছে। ভারত নিয়ন্ত্রিত জন্মু-কাশ্মীর আর পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীর উভয় অংশের মানুষের উপর চালানো এই জরিপে দেখা যায়, যদি হঠাত গণভোটের মাধ্যমে বেছে নিতে বলা হয় তারা ভারতের সাথে না পাকিস্তানের সাথে থাকতে চায় না স্বাধীন হতে চায়, তাহলে তাদের মধ্যে আজাদ কাশ্মীরের ৪৪% স্বাধীন কাশ্মীর এবং ৫০% পাকিস্তানের সাথে যুক্ত থাকার পক্ষে। অন্যদিকে জন্মু-কাশ্মীরের মাত্র ২৮% ভারতের সাথে থাকার পক্ষে রায় দিয়েছেন অন্যদিকে ৪৩% অধিবাসী-ই স্বাধীন কাশ্মীর বেছে নেয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।

যে জনগোষ্ঠীর নারী-পুরুষ-শিশু-যুবা নির্বিশেষে পাথর হাতে রাস্তায় নেমে আসে দখলদারের বুলেট মোকাবেলা করতে তাদের আর দাবীয়ে রাখার সাধ্য কারো নেই। আমরা কাশ্মীরবাসীর স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে সংহতি প্রকাশ করছি।

‘নিযেই রোগি ওষুধ দিবো কাকে?

0 মন্তব্য(গুলি)

বর্তমান মুসলিমবিশ্বের পরিস্থিতি যদি এক বাক্যে প্রকাশ করার কথা বলা হয়, তাহলে মুখ ফসকে যে বাক্যটি বেরিয়ে আসবে তা হচ্ছে-

‘সর্বাঙ্গে ব্যথা ওষুধ দিবো কোথা?’

প্রথমে এই কথার সাথে আপনার দ্বি-মত করার অবকাশ আছে, যদি শেষপর্যন্ত আলোচনায় সাথী হন তাহলে আশা করি এই দ্বি-মতটা অনেকাংশ কমে আসবে।
আসুন, তাহলে এবার আলোচনাটা সামনে ঠেলে নেই।

আমরা যদি মুসলিমউম্মাহের বর্তমান শত্রুর গতিবিধির উপর নজর বুলাই, তাহলে দেখতে পাই, যে, ইসলামের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আমাদের যতসব শত্রু আছে, সবাই বর্তমানে ভিন্ন ভিন্ন অজুহাতে এই মজলুম উম্মাহের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।

আমাদের এক শত্রু ইয়াহুদী। তারা আমাদের প্রথম কিবলা কেড়ে নিয়েছে, এখন সে কিবলায় আমাদের প্রবেশও বন্ধ করে দিচ্ছে।
আমাদের আরেক শত্রু হচ্ছে খৃষ্টান। তারা ভিন্ন ভিন্ন ফ্রন্টে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত। আফগানিস্তান, ইয়েমেন, সিরিয়া, ইরাক, ওয়াজিরিস্তান, মালি, সোমালিয়া, সুদান, মধ্য-আফ্রিকা এবং বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে তারা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে বিভিন্ন পতাকা নিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।

আমাদের আরেক শত্রু হচ্ছে মুশরিক। এরা কখনো হিন্দুর অবয়বে, আবার কখনো বৌদ্ধের অবয়বে চীন, ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলংকায় আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।
আমাদের আরেক শত্রু হচ্ছে মুনাফিক তথা যিন্দীক। এই শত্রুরা কখনো শীয়ার আকৃতিতে, আবার কখনো নুসাইরীর আকৃতিতে ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন, লেবানন ও বাইরাইনে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।

কুরআন শরীফে উপরোক্ত চার শত্রুকে ইসলাম ও মুসলমানদের প্রধান শত্রু চিহ্নিত করা হয়েছে। তাই এভাবে বিন্যাস করলাম। আর আজ এই সব শত্রু একাট্টা হয়ে আমাদের নির্মূল করতে নেমেছে। এদিকে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা ও পরিচর্যা করছে শত্রুকুল গডফাদার জাতিসংঘ।
অতীতে কোনোদিন সব শত্রু আমাদের বিরুদ্ধে একসাথে এভাবে একাট্টা হয় নি।

এতো গেলো আমাদের শত্রুর গতিবিধি।
এবার আমাদের নামধারী মিত্র মুসলিম শাসকদের উপর চোখ বুলান। তাহলে দেখবেন, যে, শত্রুকুল গডফাদার জাতিসংঘ, আমেরিকা ও ইইউয়ের সামনে তাদের জুতা সাফ করা ও হাত কচলিয়ে দাঁড়ানো ছাড়া আর কোনো অবদান নেই। যে জায়গায় গেলে ওই শত্রুরা নিজেদের জুতো কর্দমাক্ত হওয়ার আশঙ্কা করে সেখানে তারা এদেরকে ব্যবহার করে।
সৌদী, পাকিস্তান ও তুরস্কের এ ক্ষেত্রে সমান অবস্থা।

এতো গেলো বহির্বিশ্বের অবস্থা। এবার আসুন, আমরা বাংলাদেশে প্রবেশ করি।
প্রথমেই আমরা বাংলাদেশের ইসলামি রাজনীতির উপর একটু চোখ বুলাই। তখন শেখ হাসিনার কথাই প্রথমে আমাদের স্মরণ হবে, মানে- ‘বাংলাদেশে ইসলামি রাজনীতির জিরো টলারেন্স চলছে’!
কথাটার উপর অনেকে তীব্র আপত্তি তুলে বলবেন, যে, আপনার চোখে কি বাংলাদেশের ইসলামি দলগুলোর আন্দোলন-ফান্দোলন নজরে পড়ে না?
আমি বলবো, হ্যাঁ, নজরে পড়ে! কিন্তু আমি জানতে চাচ্ছি, যে, ইসলামি রাজনীতির প্রধান উদ্দেশ্য কী? আন্দোলন-ফান্দোলন? না, শরীয়াহ প্রতিষ্ঠা? দেখানতো, এতো বছর রাজনীতি করার পর অন্তত একটি এলাকায় এক সেকেণ্ডের জন্যে শরীয়াহ প্রতিষ্ঠা করার খবর! যদি হালির পর হালি ইসলামি দল বৃদ্ধির নাম ইসলামি রাজনীতির সফলতা হয়ে থাকে, তাহলে কেনো এদেশে পাপাচারের হার বাড়ছে? কেনো শাহবাগে বদমাশদের প্রকাশ্য র‍্যালি হচ্ছে? এটা কি ইসলামি রাজনীতির ব্যর্থতা নয়?
আপনি একদিকে ঘরের মধ্যে এসি চালু করলেন, অন্যদিকে দরোজা-জানালা খুলে দিলেন, তাহলে কী এ এসির কোনো অর্থ আছে? বস্তার পর বস্তা ওষুধ জমা করে খেলেন, কিন্তু রোগ মোটেও কমলো না। তাহলে কি এ ওষুধের কোনো অর্থ আছে?
এমনিভাবে হালির পর হালি ইসলামি দল গজিয়ে ওঠার পরও যদি এদেশে শরীয়াহ প্রতিষ্ঠা হয় না, পাপাচার বেড়েই চলে, তবে কি এটা ইসলামি দলের সফলতা?
তাহলে কি হাসিনার কথা সত্য নয়?

আপনি এবার এদেশের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে চোখ বুলান, তাহলে দেখবেন, যে এটা কোনো মানুষ তৈরির সিলেবাস নয়, বরং এটা হচ্ছে পরিমল-পান্না তৈরির সিলেবাস, যার দ্বারা তৈরি হবে ঐশীর মতো মেয়ে, পরবর্তীতে এরাই কয়েকটা বয়ফ্রেন্ডের সাথে শয়নের জন্যে মা-বাপকে কুপিয়ে মারবে। এটা হচ্ছে মানুষকে পশু বানানোর সিলেবাস। যার মধ্যে প্রধান লক্ষ্য পেট। সকাল-সন্ধ্যা কুকুরের মতো পেটের ধান্ধায় ছুটাই এর প্রধান উদ্দেশ্য। নিজের সৃষ্টিকর্তাকে চিনা এর লক্ষ্য কখনোই নয়!
তাবুল মালের কথা শুনলে এটা আরো দৃঢ় হয়।

এবার আসুন, আমাদের মাসলাকি ও মাজহাবী বিষয়ের উপর চোখ বুলাই। তাহলে আমরা দেখতে পাবো, তাতারীদের হাতে বাগদাদ পতনের সময় সেকালের আলেমদের যে অবস্থা ছিলো, কম্যুনিস্টদের হাতে বোখারা-সমরকন্দের পতনের সময় তখনকার আলেমদের যে অবস্থা ছিলো, বর্তমানে এই উম্মাহের কঠিন দুর্দিনে আমাদের আলেমদের অবস্থা এরচে’ কম নয়। যেসব মাসয়ালা-মাসায়িলের সমাধান আমাদের পুর্বসুরী আলেমরা বছরের পর বছর দিনকে রাত করে, রাতকে দিনকে করে সূর্যের আলোর মতো পরিষ্কার সমাধান দিয়ে গেছেন, আজ সেসব মীমাংসিত বিষয় নিয়ে নতুনভাবে ফিতনা ছড়ানো হচ্ছে। ফোঁড়াকে চুলকাতে চুলকাতে টিউমার বানানো হচ্ছে। আর সাথে আছে ফ্রী ফতোয়া।
আরেকদল আছেন, যারা টিভি স্ক্রীনের সামনে স্টুডিওতে এসির ভেতরে বসে শুধু ‘শিরক’ ‘বেদাত’ বলে মুখের বুলি আওড়াচ্ছেন, অথচ তাদের বেদাত বুলি হচ্ছে সীমিত কয়েকটি বিষয়ের উপর, রাষ্ট্রকর্তৃক শতাধিক শিরক-বেদাত নিয়ে ওদের টু শব্দ নেই। আছেন শুধু গরীবদের শিরক-বেদাত নিয়ে নিজেদের ইলমের লালবাতি জ্বালাতে।

এতক্ষণ আমার সাথে থাকার পর বলুন, উম্মাহের বর্তমান অবস্থা নিয়ে আমার উপরোক্ত প্রবাদ স্মরণ করা কি ভূল হয়েছে?
আশাকরি এতক্ষণের সহচর্য আমাদের মতের দূরত্ব অনেকটা কমিয়ে ফেলবে।

বর্তমান মুসলিম অবস্থাকে যদি আপনি একটি বিল্ডিংয়ের সাথে তুলনা করেন, তাহলে জেনো রাখুন, এই বিল্ডিংয়ের পিলার, ইট, বালু, পাথর ও রঙ সহ সবকিছুর ‘ডেট ওভার’ হয়ে গেছে। যেকোনো সময় রানা প্লাজার কাহিনী ঘটতে পারে। এই যদি হয় বিল্ডিংয়ের অবস্থা, তাহলে কি আমাদের উচিৎ নয়, এটা ভেঙ্গে নতুন আরেকটি বিল্ডিং নির্মাণ করা?

আজ ইসলাম নামক বিল্ডিংয়ের ভেতর বস্তুবাদ, ভোগবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, শিরক ও বেদআত ইত্যাদি পিলার, ইট, পাথর, বালু, সিমেন্ট হিসেবে ঢুকে তা পতনোন্মখ করে দিয়েছে। সুতরাং এটা তছনছ করে নতুন এক বিশ্বব্যবস্থা রচনা করতে হবে, যেভাবে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরবের জাহিলি ব্যবস্থা উচ্ছেদ করে ইসলাম নামক বৃক্ষের জন্ম দিয়েছেন। নতুবা কখনো পিলার, আবার কখনো ইট বদল করে বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। আর এই নতুনব্যবস্থা হচ্ছে আমাদের হারানো ধন, গৌরবের মুকুট ‘খিলাফাহ আলা মিনহাজিন নবুওয়াহ’।

যে খলীফা নির্বাচিত হবেন উম্মাহের দ্বীনদার প্রভাবশালী ব্যক্তি ও আলেমদের মতামতের দ্বারা। যে খলীফার প্রধান লক্ষ্য হবে উম্মাহকে এক করা, বিভক্ত করা নয়। যিনি শুধু শুধু বাইয়াহ তলব না করে উম্মাহের সংরক্ষণের দিকে মনোযোগী হবেন। যাকে এই উম্মাহ স্বাগত জানাবে, যার ভয়ে পালিয়ে যাবে না, সমুদ্রে ডুবে মরবে না। যিনি হযরত আবু বকর রাজিয়াল্লাহু আনহুর মতো একই সাথে কয়েক ফ্রন্টে সৈন্য পরিচালনা করবেন, হযরত উমর রাজিয়াল্লাহু আনহুর মতো ফেকহী ইখতেলাফকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সমাধান দিবেন। যিনি হযরত হাসান রাজিয়াল্লাহু আনহুর মতো প্রয়োজনে ক্ষমতা থেকে সরেও উম্মাহের আভ্যন্তরীণ রক্তপাত বন্ধে সচেষ্ট হবেন। যার ভয়ে ইউরোপ-আমেরিকা আমাদের উপর ছড়ি ঘুরানোর পরিবর্তে ট্যাক্স দিবে।

জানি এগুলো স্বপ্ন, কিন্তু এর বাস্তবায়ন অসম্ভব নয়।
ইশ! যদি এমন শাসকের ছায়ায় অন্তত একদিন বসবাস করতে পারতাম!


হায়দ্রাবাদ গণহত্যাঃ ভারতে মুসলিম নিধনের চেপে রাখা অধ্যায়

0 মন্তব্য(গুলি)

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ক্লান্ত ব্রিটেন সিদ্ধান্ত নিল তারা ভারত উপমহাদেশের শাসনভার ছেড়ে দেবে। সরাসরি ব্রিটিশ শাসিত প্রদেশগুলোর কেউ পাকিস্তানে গেল, আর কেউ ভারতের সঙ্গে রইল। এছাড়াও ভারতে অনেকগুলো রাজ্য ছিল যেগুলো ব্রিটিশদের দ্বারা নয় বরং অনেকটা স্বাধীন রাজা দ্বারা শাসিত হত ( উদাহরণস্বরূপ কাশ্মীর, যা হিন্দু মহারাজা হরি সিং কর্তৃক শাসিত হত)।
এ সকল রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে ধনী ও শক্তিশালী ছিল হায়দ্রাবাদ রাজ্য। হায়দ্রাবাদের নিজস্ব সেনাবাহিনী, এয়ারলাইন্স, কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক ও মুদ্রা ছিল। ছিল অভ্যন্তরীণ রেল যোগাযোগ ব্যাবস্থা। জনসংখ্যা ছিল দেড় কোটিরও বেশী আর আয়তন বাংলাদেশের দেড়গুণ। হায়দ্রাবাদের তৎকালীন নিযাম-উল-মুলক উসমান আলি খান ছিলেন সে সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি।
ভারত বিভাগের সময় ব্রিটিশ সরকার কাশ্মীর, হায়দ্রাবাদসহ সকল স্বাধীন রাজ্যকে তিনটির মধ্যে যে কোন একটি বেছে নিতে বলেছিল; হয় ভারতের সাথে একীভূত হওয়া, কিংবা পাকিস্তানের সাথে নতুবা দুটোর বাইরে স্বাধীন থাকা। নিযাম উসমান আলি খান শেষেরটি বেছে নিলেন। ভারতের কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ প্রমাদ গুনলো। ভারতের ঠিক মধ্যখানে একটি স্বাধীন মুসলিম শাসনাধীন রাজ্য তাদের কাছে দুঃস্বপ্নের মত মনে হল। শাসকের আসনে মুসলিমরা থাকলেও হায়দ্রাবাদের মোট জনসংখ্যার ৮৫% ছিল হিন্দু। হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতারা তাই হায়দ্রাবাদ দখল করতে মাঠে নেমে পড়লেন।
যুদ্ধ হল শুরু
উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলগুলোর ইন্ধনে হায়দ্রাবাদের অভ্যন্তরে কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে মুসলিম জমিদার ও উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের গুপ্তহত্যা শুরু হয়। এক হিসাব মতে প্রায় দুই হাজার ব্যক্তি তাদের হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। এ পরিস্থিতিতে নিযাম স্থানীয় যুবকদের নিয়ে গঠিত রাজাকারদের ( বাংলায় যার অর্থ হয় স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী) দায়িত্ব দেন হত্যাকাণ্ড প্রতিরোধের। রাজাকারেরা কমিউনিস্টদের পাকড়াও অভিযান শুরু করে, অভিযুক্তদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। কমিউনিস্টরা সবাই ছিল হিন্দু, সুতরাং এ সুযোগকে কাজে লাগাল ভারত সরকার। বহুল প্রতীক্ষিত হায়দ্রাবাদ দখলের অজুহাত এখন তাদের হাতে; তারা প্রচার করলো উগ্র মুসলিম রাজাকারেরা পাইকারী হারে হিন্দুদের হত্যা করছে। ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৪৮ সালে ‘অপারেশন পোলো’ সাংকেতিক নামে ভারতীয় সেনাবাহিনী চারদিক থেকে হায়দ্রাবাদ আক্রমণ শুরু করে। বিশ্বের কেউ সেদিন হায়দ্রাবাদের সাহায্যে এগিয়ে আসেনি। লক্ষাধিক ভারতীয় সৈন্যের বিপরীতে হায়দ্রাবাদের ট্রেনিংপ্রাপ্ত প্রফেশনাল সৈন্যের সংখ্যা ছিল মাত্র ছয় হাজার, তাদের সাথে ছিল আর বিশ হাজার রাজাকার বাহিনী। এ অসম লড়াইয়ে চারদিন প্রতিরোধ করে অবশেষে পরাজয় মানে হায়দ্রাবাদ বাহিনী। ১৭ সেপ্টেম্বর সকালে সিকান্দারাবাদে ভারতীয় মেজর জেনারেল জয়ন্ত নাথ চৌধুরীর নিকট আত্মসমর্পণ করেন হায়দ্রাবাদের সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল সাইয়েদ আহমেদ এল এদরুস। স্বাধীনতা হারিয়ে হায়দ্রাবাদ ভারতের একটি প্রদেশে পরিণত হয়।
গণহত্যা
হায়দ্রাবাদ দখলের পরপরই গণহত্যার খবর আসতে থাকে। আবার ভারতজুড়ে মুসলিমদের গণঅসন্তোষের ভয়ে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু কংগ্রেসের সংসদ সদস্য পন্ডিত সুন্দরলালের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন যাতে হিন্দু-মুসলিম উভয় ধর্মেরই সদস্য ছিল। এ কমিটি হায়দ্রাবাদ ঘুরে এসে তাদের রিপোর্ট জমা দেয় যা সুন্দরলাল রিপোর্ট নামে পরিচিত। নেহেরু থেকে শুরু করে মনমোহন পর্যন্ত, ভারত সরকার এ রিপোর্ট সম্পর্কে গোপনীয়তা বজায় রেখেছে। গণহত্যার বিষয়ে বহির্বিশ্ব ও ভারতের জনগণকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখা হয়। সর্বশেষে ২০১৩ সালে দিল্লীর নেহেরু স্মৃতি জাদুঘরে এ রিপোর্ট জনসম্মুখে আসে। কমিটির মতে, খুব কম করে ধরলেও ২৭০০০ থেকে ৪০,০০০ মানুষ নিহত হয়েছিলেন। যদিও এ জি নুরানি ও অন্যান্য গবেষকদের মতে এ সংখ্যা দুই লাখ বা তার থেকেও বেশী। কমিটির রিপোর্টে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভারতীয় সেনাবাহিনী এ সকল গণহত্যায় সরাসরি জড়িত ছিল।
“বেশ কয়েক জায়গায়, সামরিক বাহিনীর সদস্যরা শহর ও গ্রাম থেকে মুসলিম পুরুষদের ধরে নিয়ে এনে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করেছে।”
সেনাবাহিনী মুসলিম পুরোপুরি নিরস্ত্র করলেও হিন্দুদের তো নিরস্ত্র করা হয়ইনি বরং সেনাবাহিনী উৎসাহিত করেছে আর কিছু ক্ষেত্রে বাধ্য করেছে স্থানীয় হিন্দুদের, মুসলিমদের বাড়িঘর ও দোকানপাট লুটপাট করার জন্য। সুন্দরলাল রিপোর্টের সাথে পেশ করা একটা গোপনীয় নোটে হিন্দুদের রক্তলোলুপ এই চরিত্রের এক জঘন্য নমুনা দেখা যায়।
“অনেক জায়গায় আমাদের দেখানো হয় কুয়া যেগুলো ছিল পচা লাশে ভরা। এ রকম এক ক্ষেত্রে আমরা ১১ টি লাশ দেখেছি যার মধ্যে ছিল একজন মহিলা যার ছোট শিশুটি তার স্তনের সাথে লেগেছিল।”
“দেখেছি ডোবা-নালার মধ্যে লাশ ছড়িয়ে আছে। বেশ কয়েক জায়গায় দেহ পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল ; আমরা গিয়ে দেখেছি পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া হাড় আর খুলি এখনও সেখানে পড়ে আছে।”
শুধু হত্যা আর লুটই নয়, অসংখ্য মুসলিম মহিলা সশস্ত্র হিন্দু মিলিশিয়াদের হাতে ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। মুহাম্মাদ হায়দারের ভাষায়, “ হাজার হাজার পরিবার ভেঙ্গে গিয়েছিল, শিশুরা তাদের পিতামাতার কাছ থেকে আর স্ত্রীরা তাদের স্বামীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলেন। মহিলা ও তরুণীদের ধাওয়া করা হত আর ধর্ষণ করা হত”।
যাদের সামর্থ্য ছিল তারা পাকিস্তানে হিজরত করেছিলেন। জাতিসঙ্ঘ ও মানবাধিকার তখন অন্ধ ছিল। বিশ্বের “সর্ববৃহৎ গনতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে” এ অপরাধের জন্য কাউকে শাস্তি পেতে হয়নি, কারো বিচার হয়নি বরং এর দৃশ্যায়ন আবার ঘটেছিল গুজরাটে।
তথ্যসূত্রঃ
1-http://www.hinduonnet.com/thehindu/…
2- http://www.bbc.com/news/magazine-24…
Thomson, Mike (24 September 2013). “Hyderabad 1948:
India’s hidden massacre”. BBC
3- Indian integration of Hyderabad, Wikipedia
4- Hyderabad state, Wikipedia

মুসলমানের সংখ্যা গোপন ও কমানোর চেষ্টা

Sunday, April 10, 2016

0 মন্তব্য(গুলি)

মুসলমানের সংখ্যা গোপন ও কমানোর চেষ্টা

আবুল হুসাইন আলেগাজী

পাশ্চাত্যের ষড়যন্ত্র ও শত্রুতার শিকার মুসলমানরা পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় ও দ্বিধাবিভক্ত জাতি হওয়া সত্ত্বেও এখনো তারা সকল কাফিরের কাছে আতঙ্কের বিষয়। কারণ, ইসলাম মানুষকে দুনিয়ার উপর আখেরাতের চিন্তাকে প্রাধান্য দেয়ার নির্দেশ দেয় এবং আখেরাতে মুক্তি চাইলে সকল মানুষের জন্য ইসলামে প্রবেশ অপরিহার্য বলে ঘোষণা দেয়। আরো পরিষ্কার ভাষায় বলতে হলে ইসলাম পৃথিবীর সকল ধর্মকে রহিত ও বাতিল বলে ঘোষণা দেয় এবং মানুষকে মনমত চলার পরিবর্তে কোরআন ও হাদীছের নির্দেশনা মত চলার আদেশ করে। ইসলাম বিবাহ বহির্ভূত যৌনকর্ম, যৌনতার প্রতি আকর্ষণকারী গান-বাজনা-নৃত্য, মদ্যপান, সুদ-ঘুষ, অহঙ্কার-গৌরব, হিংসা-কৃপনতাসহ সকল অন্যায় ও অসুন্দর কাজ থেকে মানুষকে বারণ করে এবং তাদেরকে দৈনিক পাঁচওয়াক্ত নামায, বছরে একমাস রোযা, স্বচ্ছল হলে প্রতিবছর যাকাত ও জীবনে কমপক্ষে একবার হজসহ আরো বিভিন্ন ভালো ও সুন্দর কাজের জন্য আদেশ করে। এসব কারণে শয়তানের কুমন্ত্রণার শিকার অসৎ, দুষ্ট, নির্লজ্জ, ক্ষমতালোভী, অহঙ্কারী, হিংসুক, কৃপন ও বিলাসিতাপ্রিয়দের কাছে ইসলাম পছন্দ হয় না। তারা বিশ্বাস করে ‘দুনিয়াটা মস্ত বড়, খাওদাও ফুর্তি করো’ এবং ‘আমিই বড়, বাকীরা সবাই ছোট’ নীতিতে।
সন্দেহ নেই, বর্তমান পৃথিবীর মুসলমানদের অধিকাংশই ইসলামকে পরিপূর্ণরুপে মেনে চলে না এবং তাদের সমাজে রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবি নামের কিছু ইসলাম-আতঙ্ক রোগে আক্রান্ত কিছু লোক রয়েছে। তা সত্ত্বেও জাতি হিসেবে মুসলমানরই পৃথিবীর সবচেয়ে ধর্মপরায়ণ ও ধর্মচর্চাকারী জাতি। ইসলাম নিয়ে এ পর্যন্ত যত কিতাব-পত্র লেখা হয়েছে এবং হচ্ছে, তার একদশমাংশও পৃথিবীর বাকী সব ধর্ম নিয়ে লেখা হয়নি এবং হচ্ছে না। কারণ, অন্যসব ধর্ম রহিত, বিকৃত এবং অসম্পূর্ণ। তাই অনুসারীরা সেগুলোর চর্চায় তৃপ্তি পায় না। যার ফলে ওইসব ধর্মের অনেক অনুসারী প্রতিনিয়ত এবং পৃথিবীর সবপ্রান্তে সত্যের ধর্মে ইসলামে প্রবেশ করছে ।
সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পরাশক্তি হিসেবে বিশ্বরাজনীতিতে মুসলমানরা হাজার বছরের বেশি সময় অধিষ্ঠিত থাকলেও বিগত কয়েকশ বছর থেকে তারা পাশ্চাত্যের ষড়যন্ত্রের জালে আটকে রয়েছে। এখন তারা পৃথিবীর সবচেয়ে মজলুম ও বিভক্ত জাতি। সামরিক ও অর্থনৈতিক ভাবে তাদেরকে পশ্চিমারা কোনোভাবেই মাথাছাড়া দিয়ে উঠতে দিচ্ছে না। মুসলমানরা আজ এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপ সবখানে নির্যাতিত ও অধিকার বঞ্চিত। একজন খ্রিষ্টান নিহত হলে পশ্চিমা রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবিরা যেভাবে প্রতিবাদ মুখর হয়, হাজারো মুসলমান মরলেও তারা সেভাবে প্রতিবাদ করে না। আজ আরাকান ও মধ্য আফ্রিকায় মুসলমানরা বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানদের হাতে গণহত্যার শিকার। এর আগে রাশিয়া, ভারত, চীন, ফিলিপাইন, ফিলিস্তীন, বসনিয়া ও কসোভোসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মুসলমানদের উপর গণহত্যা চালানো হয়েছে। খ্রিষ্টান অধ্যুষিত পূর্বতিমুর ও দক্ষিণ সুদানের স্বাধীনতা লাভে জাতিসংঘসহ পশ্চিমা জগত উপযুক্ত পদক্ষেপ নিলেও ফিলিপাইনের মিন্দানাও, দক্ষিণ থাইল্যান্ড, বার্মার আরাকান, চীনের পূর্ব তুর্কিস্তান (ঝিংজিয়ান), ভারতের কাশ্মির এবং চেচনিয়া ও দাগিস্তানসহ রুশফেডারেশভুক্ত ১২টি মুসলিম প্রজাতন্ত্রকে স্বাধীন করার জন্য আমেরিকা ও পশ্চিমা জগত কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি; বরং অনেক ক্ষেত্রে স্বাধীনতকামীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছে। ইতোমধ্যে চীন পূর্ব তুর্কিস্তানে হান জনগোষ্ঠীর লোকদের পুনর্বাসিত করে তাতে মুসলমানদের সংখ্যালঘু করে ফেলেছে। একই ভাবে এবং হত্যা ও নির্যাতন চালিয়ে বার্মাও আরাকানে মুসলমানদেরকে সংখ্যালঘুতে পরিণত করার কাজ সমাপ্ত করেছে। কাছাকাছি পরিস্থিতি বিরাজ করছে থাইল্যান্ডের দখলকৃত মুসলিম অধ্যুষিত ফাতানি অঞ্চলে।
সবাই জানে, দাম্পত্য ও সন্তান লালন-পালনকে মুসলমানরা তাদের দীনের অংশ মনে করার কারণে তারা জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিকে গুরুত্ব দেয় না। যার ফলে বর্তমান ইউরোপসহ সবখানে মুসলিম জনসংখ্যার বদ্ধির হার অন্যান জাতির চেয়ে অনেক বেশি। ২০০৯ সালে কানাডার ইসলামবিদ্বেষী একটি মহল Muslim Demographics: The Islamic Tidal Wave নামে প্রকাশ করা একটি প্রামাণ্যচিত্রে বলেছে, বর্তমানে হল্যান্ড ও বেলজিয়ামে জন্ম নেয়া শিশুদের ৫০% মুসলিম। ইউরোপীয় ইউনিয়ন জানিয়েছে, ২০২৫ সালে সমগ্র ইউরোপে মুসলিমদের জন্মের হার ৩৩% গিয়ে পৌঁছবে।
মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধির এ বাস্তবতা সত্ত্বেও জাতিসংঘ, সিআইএ, উইকিপিডিয়া, বিবিসি, কথিত পিউ রিসার্চ সেন্টার, গ্যালপ, রয়টার্স ও এ এফপিসহ পশ্চিমা তথ্য মাধ্যমগুলো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মুসলমানদের সংখ্যা গোপন ও কমানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের সাথে যোগ দিয়েছে মুসলিম সমাজের ইসলাম আতঙ্কে ভোগা রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবিরা। তারা হয়তো ভাবছে তাদের এ চাতুরি অলস ও উদাসীন মুসলমানদের নজর এড়িয়ে যাবে। কিন্তু সব মুসলমান অলস ও উদাসীন হলে কি তাদের অস্তিত্ব এতোদিন বিদ্যমান থাকতো। নিশ্চয় অনেক মুসলমান রয়েছে যারা পশ্চিমা ও তাদের দোসরদের ষড়যন্ত্র ও চাতুরি নিয়ে দিনের পর দিন ভাবে এবং তা মুসলিম সমাজকে অবহিত করে।
আমরা বাংলাদেশের মুসলমানরা ১৯৯০ সাল থেকে শুনে আসছি যে, বাংলাদেশে মুসলমানের হার ৯০%। বিগত চব্বিশ বছরে বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় পাঁচ থেকে ছয় কোটি বৃদ্ধি পেয়েছে। তা সত্ত্বেও দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় এখনো প্রচার করা হচ্ছে বাংলাদেশে মুসলমানের হার ৮৫% থেকে ৯০%। অথচ জরিপ চালালে বা চালানো জরিপের তথ্য প্রকাশ করা হলে দেখা যাবে, বর্তমানে বাংলাদেশে মুসলমানের হার ৯৫% থেকে ৯৭%। আমাদের দেশের রাজনীতিকরা সম্ভবত মনে করছে, মুসলমানের সংখ্যা যদি শতের কাছাকাছি বলে জানানো হয়, তাহলে ইসলামী দলগুলো ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন আরো বেগবান করবে কিংবা অমুসলিমদের প্রতি তারা আরো হেয়মূলক আচরণ করবে। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, ইচ্ছা করলে ১০% কিংবা ৫৫% মুসলমানের উপরও ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা করা যায়, এতে অমুসলিমদের কোনো ক্ষতি বা তাদের স্বাধীনতায় আঘাত আসবে না। তাছাড়া ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান, হিন্দু ও বৌদ্ধ সব ধর্মের অনুসারীরা ইসলামভীতির কারণে মুসলমানদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালালেও পৃথিবীর কোনো দেশে কখনো মুসলমানরা অমুসলিমদের উপর গণহত্যা চালায়নি। এমনকি বর্তমান পাকিস্তানেও হিন্দু, শিখ ও খ্রিষ্টানরা তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা পরিপূর্ণরুপে ভোগ করছে। ওখানে একজন হিন্দু সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিও হয়েছিল। সুতরাং ইসলামভীতি শয়তানের কুমন্ত্রণা ছাড়া আর কিছই নয়।
বাংলাদেশে মুসলমানের সংখ্যা গোপন ও কমানোর যে নীতি পশ্চিমা মিডিয়া ও তাদের দোসররা অনুসরণ করেছে, একই নীতি তারা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মুসলমানের সংখ্যার ক্ষেত্রেও করেছে এবং করছে। মুসলমানদের কোনো আন্তর্জাতিক জরিপ সংস্থা না থাকায় বিভিন্ন ইসলামী ওয়েবসাইট ও ইসলামী প্রতিষ্ঠানগুলো পশ্চিমা মিডিয়া বিশেষত wikipedia, www.countrystudies.us, www.cia.gov, www.pewforum.org ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের প্রচারিত তথ্যের উপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, এসব পশ্চিমা মিডিয়ার তথ্যের বৈপরিত্ব দ্বারা সচেতন পাঠকের কাছে তাদের ষড়যন্ত্র ও চাতুরি ধরা পড়ছে। উদহারণ স্বরুপ বিখ্যাত জ্ঞানের মাধ্যম ‘উইকিপিডিয়া’র কথা ধরা যাক। ২০১২ সালে তাদের আরবী সংস্করণে ‘দেশ ভিত্তিক মুসলিম জনসংখ্যা’ পাতায় উল্লেখ করা হয়েছে, মুসলিমের হার আফ্রিকার দেশ বুর্কিনা ফাসোতে ৮৫%, ইরিত্রিয়ায় ৮০%, নাইজেরিয়ায় ৭৬%, ইথিওপিয়ায় ৬৫%, ক্যামেরুনে ৬৫%, গিনি বিসাউতে ৬৫%, সিয়েরা লিওনে ৬২%, আইভরিকোষ্টে ৬০% , টগোতে ৬০%, বেনিনে ৬০%, তাঞ্জানিয়ায় ৫৫%, মোজাম্বিকে ৫০%, গ্যাবনে ৫০%, উগান্ডায় ৪৫% ও ঘানাতে ৩০%।
পরবর্তীতে একই শিরোনামের একটি পাতায় আমেরিকা ভিত্তিক www PewResearch.org এ উদ্ধৃতিতে উইকিপিডিয়া এসব দেশে মুসলিমের হার লিখেছে, বুর্কিনা ফাসোতে ৫৮%, ইরিত্রিয়ায় ৩৬%, নাইজেরিয়ায় ৪৭%, ইথিওপিয়ায় ৩৩%, ক্যামেরুনে ১৮%, গিনি বিসাউতে ৪২%, সিয়েরা লিওনে ৭১%, আইভরিকোষ্টে ৩৬%, টগোতে ১২%, বেনিনে ২৪%, তাঞ্জানিয়ায় ২৯%, মোজাম্বিকে ১২%, গ্যাবনে ৯%, উগান্ডায় ১২% ও ঘানাতে ১৬%।
এখানে দেখা যাচ্ছে, একমাত্র সিয়েরা লিওন ছাড়া বাকী সব দেশে মুসলমানের সংখ্যা কল্পনাতীত হারে কমে গেছে। আমি এখানে কয়েকটি দেশের উদাহরণ দিলাম মাত্র। নতুবা মুসলমানদের সংখ্যা নিয়ে একই ধরণের গোঁজামিলের আশ্রয় উইকিপিডিয়া পৃথিবীর প্রায় সব দেশের ক্ষেত্রেই নিয়েছে। উল্লেখ্য, পূর্বোল্লিখিত দেশগুলোর মধ্যে ইরিত্রিয়া, ইথিওপিয়া, তাঞ্জানিয়া ও ঘানা ব্যতীত বাকী ১১টি দেশের সবটিই মুসলিম বিশ্ব সংহতি সংস্থার (ওআইসি) সদস্য।
আজ (২২/০৩/২০১৪) উইকিপিডিয়ায় ধরা পড়া আরেকটি বৈপরিত্ব্যের কথা বলছি। ‘দেশ অনুসারে মুসলিম জনসংখ্যার তালিকা’ পাতার আরবী সংস্করণে দেখা যাচ্ছে সৌদি আরবের পশ্চিমে অবস্থিত লোহিত সাগরের পশ্চিম পাড়ের আরবী রাষ্ট্রভাষার দেশ ইরিত্রিয়ায় মুসলমানের সংখ্য ৫২%। কিন্তু পাতাটির ইংরেজি সংস্করণে গিয়ে দেখা গেল ইরিত্রিয়ায় মুসলমানের সংখ্য ৩৬%। একই ভাবে ইথিওপিয়াতেও মুসলমানের সংখ্যা দেখাচ্ছে আরবী পাতার ৪০% এর স্থলে ৩৪%।
এতো গেল পশ্চিমা মিডিয়ার মিথ্যাচারের একটি দিক। এদের আরেকটি জঘন্য ও হাস্যকর মিথ্যাচার হচ্ছে সৌদি আরবে মুসলমানের সংখ্যা ৯৭% লেখা। অথচ সচেতন সবাই জানে যে, সৌদি আরবে কোনো অমুসলিম নাগরিক নেই এবং সাংবিধানিক ভাবে ওই দেশে কোনো অমুসলিমের নাগরিক হবার সুযোগও নেই। উইকিপিডিয়া বলতে পারে, আমেরিকার গ্যালপ সংস্থার জরিপে দেখা গেছে, সৌদি আরবের ৫% মুসলমান ধর্ম পালন করে না। তাই আমরা তাদেরকে মুসলমানের তালিকা থেকে বাদ দিয়েছি। তাহলে উইকিপিডিয়ার কাছে প্রশ্ন্, সৌদি আরবে মুসলমানের সংখ্যাতো তাহলে হওয়া উচিত ৯৫% এবং এতে একথাও উল্লেখ করা দরকার ছিল যে, এ সংখ্যা কেবল ধার্মিক মুসলমানদেরই; অধার্মিকদের নয়। উইকিপিডিয়ার কাছে এখানে এ প্রশ্নও করা যায়, কোরআনী আইন, ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা এবং মুসলমানদের কেবলা ‘কা’বা শরীফ’ ও তাদের নবীর জন্ম ও মৃত্যুভূমির দেশ সৌদি আরব নিয়ে গ্যালপের কথিত ওই জরিপ কোনো ষড়যন্ত্র নয়তো ?
উইকিপিডিয়াসহ পশ্চিমা মিডিয়ার আরেকটি মিথ্যাচার হচ্ছে, পৃথিবীতে খ্রিষ্টধর্মের অনুসারীর সংখ্যা মুসলমানদের চেয়ে বশি বলে প্রচার করা। তাদের মতে ইসলাম পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম, খ্রিষ্টধর্মই প্রধান। ইংরেজী উইকিপিডিয়ার Religions by country পাতার (২১/০৩/২০১৪) তথ্য মতে বিশ্বে খ্রিষ্টানের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৩৩.৩২% আর মুসলমানের সংখ্যা ২১.০১%। অথচ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মুসলমানদের হার নিয়ে তাদের প্রচরিত ও প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য বিচার করলে দেখা যায়, পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ২৮.২৬% ভাগই মুসলমান, খ্রিষ্টান হলো ২৭%। তবে সুখের বিষয়, ইংরেজী সংস্করণের অন্ধ অনুসারী উইকিপিডিয়ার ‘বাংলা সংস্করণ’ এর ‘দেশ অনুসারে মুসলিম জনসংখ্যার তালিকা’ পাতার ভূমিকায় বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে সারা বিশ্বে মুসলমানদের সংখ্যা দাঁড়াবে ২০৩ কোটি ৪০ লাখ এবং খ্রিষ্টানদের সংখ্যা দাঁড়াবে ২০৩ কোটি ৩০ লাখ। কিন্তু পশ্চিমা মিডিয়া নির্ভর www.muslimpopulation.com ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে ২০১৪ সালে মুসলমানে সংখ্যা ২০৩ কোটি ৮ লাখ হয়েছে। সত্যের কাছাকাছি তথ্য দেয়ায় বাংলা উইকিপিডিয়াকে ধন্যবাদ।

২২-৩-২০১৪